তাত্তার্থ সূত্র অনুযায়ী পুরুষার্থ ব্যাখ্যা করো
তত্ত্বার্থসূত্র অনুযায়ী “পুরুষার্থ” মানে শুধু বাহ্যিক পরিশ্রম (money, job, success) নয়, মূলত আত্মার মুক্তির জন্য সঠিক আধ্যাত্মিক চেষ্টা।
তত্ত্বার্থসূত্রে পরিষ্কারভাবে বলা আছে – “सम्यग्दर्शनज्ञानचारित्राणि मोक्षमार्गः।” অর্থাৎ – সম্যক দর্শন, সম্যক জ্ঞান ও সম্যক চারিত্র – এই তিনটাই মোক্ষের পথ।
তাত্ত্বার্থ সূত্রের আলোকে পুরুষার্থ ব্যাখ্যা করলে:
- সম্যক দর্শনের দিকে চেষ্টা (श्रद्धा / सही दृष्टि)
- আত্মা আছে, সে চিরন্তন, নিজ পাপ-পুণ্যের ফলা ভোগ করছে – এই সত্যকে গভীরভাবে মানা ও অনুভব করা। - মিথ্যা দর্শন, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস থেকে নিজেকে সরাতে সচেতন চেষ্টা – এটাই এক ধরনের পুরুষার্থ।
- সম্যক জ্ঞানের দিকে চেষ্টা (सही ज्ञान)
- জৈন তত্ত্ব (জীব–অজীব, পুণ্য–পাপ, আস্রব–বন্ধ–সংবর–নির্জরা–মোক্ষ) শাস্ত্র অনুযায়ী শিখতে থাকা। - ভুল জ্ঞান, অর্ধসত্য, নিজের মত করে বানানো ধারনা বাদ দেওয়া – এটাও পুরুষার্থ।
- সম্যক চারিত্রের দিকে চেষ্টা (सही आचरण)
- অহিংসা, সত্য, অচৌর্য, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ – এগুলোর যতটুকু সম্ভব নিজের জীবনে আনতে লাগাতার চেষ্টা। - ক্রোধ, মান, মায়া, লোভ কমানোর জন্য জাগ্রত থাকা – এটাই আসল আচার-পুরুষার্থ।
- তপ ও স্যামাইক ইত্যাদি দ্বারা কর্ম ক্ষয় করার চেষ্টা
- উপবাস, একাসন, ভিক্ষা নিয়ে সীমিত ভোজন, প্রায়শ্চিত্ত, স্বাধ্যায়, ধ্যান – এগুলো তত্ত্বার্থসূত্রে বর্ণিত আচার। - এগুলোর মাধ্যমে কর্মের আস্রব বন্ধ করা ও জমে থাকা কর্মের নির্জরা করা – এটাও পুরুষার্থেরই অংশ।
- পুণ্য বনাম পুরুষার্থ
- শুধু পুণ্য করে স্বর্গ, বৈভব, ভালো জন্ম পাওয়া – এটা জৈন মতে শেষ লক্ষ্য নয়। - তত্ত্বার্থসূত্রের ধারা অনুযায়ী “মোক্ষ-লক্ষী অনাসক্ত আত্ম–চেষ্টা”–ই আসল পুরুষার্থঃ - পুণ্য থাকলে ভালো অবস্থা মিলতে পারে, কিন্তু - মোক্ষ শুধু পুরুষার্থ (আত্ম সংযম, সম্যক দর্শন–জ্ঞান–চারিত্র) থেকেই হয়।
সংক্ষেপে, তত্ত্বার্থসূত্র অনুযায়ী পুরুষার্থ = সম্যক দর্শন, সম্যক জ্ঞান ও সম্যক চারিত্র লাভের জন্য, অহিংসা–তপ–স্বাধ্যায়–সংযম দ্বারা, নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করার ধারাবাহিক আন্তরিক চেষ্টা। বাহ্যিক সাফল্য নয়, আত্ম–মোক্ষ লক্ষ্য করে করা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সাধনা–কেই প্রকৃত পুরুষার্থ বলা হয়।